কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসহ জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা

বিশেষ প্রতিনিধি, কোম্পানীগঞ্জ থেকে ফিরে-কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকসহ জনবল সংকটে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্য সেবা। কনসালটেন্ট ও মেডিকেল অফিসারসহ চিকিৎসকের ২১টি পদের মধ্যে ১৪টিই শূন্য রয়েছে ৫০ শয্যার এই হাসপাতালে। এছাড়া আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও এক্সরে অপারেটর নেই; প্যাথলজিস্টের ৩টি পদ থাকলেও শূন্য রয়েছে দুটি। আয়া, ওয়ার্ডবয়সহ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির ২১টি পদের মধ্যে ১৫টি পদই শূণ্য। ফলে হাসপাতালের সকল যন্ত্রপাতি থাকলেও লোকবল সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। যার মাসুল গুনতে হচ্ছে অর্থাভাবে বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে না পারা দরিদ্র রোগীরা। এরসাথে যুক্ত রয়েছে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ।
সরেজমিনে হাসপাতালে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখা যায়, বাহিরে অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন। ভেতরে নিচ তলা থেকে তৃতীয় তলা পর্যন্ত মেঝে, রোগীদের কক্ষ ও সবগুলো টয়লেট ময়লা হয়ে রয়েছে। ডেলিভারী রুম-১, ও.টি-১ গাইনি, ড্রেস পরিবর্তন রুম (সার্জন), পোস্ট অপারেটিভ রুম খোলা পড়ে থাকলেও অপরিচ্ছন্ন। অপারেশন থিয়েটারের পাশের একটি কক্ষের ওয়ালে শেওলা পড়ে রয়েছে। নিচে ও উপরের চিকিৎসকের কক্ষগুলোর বেশিরভাগই বন্ধ। চিকিৎসকের এক-দুটি কক্ষ খোলা থাকলেও সেগুলোতে মেডিকেল রিপ্রেজেন্টিটিভদের দারুন ভীড়। শিশু ওয়ার্ডে এ কনকনে শীতের মধ্যে রোগিরা থাকতে হচ্ছে করিডোরের মেঝেতে। রোগীদের বেড কভার ও পোমগুলো ছেঁড়া। যা আছে তাও অপরিস্কার। কোনো কোনো বেডে বালিশ নেই। সুপেয় পানির ব্যবস্থা নেই। অপারেশন থিয়েটারের পাশে কক্ষে ইনকিউবিটার মেশিনটি (নবজাতক রাখা হয়) অকেজো। এক্সপার্ট না থাকায় এক্সরে ও আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিনের কক্ষ বন্ধ। অনেক রোগী অভিযোগ করে বলেন, প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সিনিয়র সেবিকা থাকলেও আয়ারা অনেক সময় ডেলিভারি করাচ্ছে। তাদের মাধ্যমে না করালে নানা হুমকিও দেয়া হচ্ছে।
পরিদর্শনকালীন দেখা হয় ওটি এটেনডেন্টস্ সাহাব উদ্দিনের সাথে। চিকিৎসক, যন্ত্রপাতিসহ বিভিন্ন কক্ষ বন্ধ ও পুরো হাসপাতাল অপরিচ্ছন্ন কেন এমন প্রশ্নে তিনি জানান, পদ অনুযায়ী চিকিৎসক নেই, আয়া-ওয়ার্ডবয় ও পরিচ্ছন্ন কর্মি নেই। সরকারিভাবে চিকিৎসা সহায়ক সকল যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত থাকলেও প্রশিক্ষিত ডাক্তার ও টেকনিশিয়ান না থাকায় এক্সরে, আল্টাসনোগ্রাফিসহ অনেক যন্ত্রপাতি এভাবে অকার্যকর অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তবে অন্য বিষয়গুলো নিয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, উপজেলার ২ লাখ ৮০ হাজার ৭২০জন নাগরিকের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের অন্যতম মাধ্যম ৫০ শয্যা বিশিষ্ট কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। এখানে বিশেষজ্ঞসহ চিকিৎসকের ২১টি পদ রয়েছে। কিন্তু মেডিকেল অফিসারের ৪টি, গাইনি কনসালটেন্ট ১টি, মেডিসিন ১টি, সার্জারী ১টি, এনেসথেসিয়া ১টি, কার্ডিওলোজি ১টি, ইএনটি ১টি, চক্ষু কনসালটেন্ট ১টি, অর্থোপেডিক্স ১টি ও চর্ম ও যৌন রোগসহ ১৪টি কনসালটেন্টের পদই শূন্য। এতে ইনডোর ও আউটডোরের রোগীরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাচ্ছে না। এছাড়া ৫টি সুইপার পদ থাকলেও শূন্য রয়েছে ৩টি; ওয়ার্ড বয় পদের ৩টিই শূণ্য; ২টি আয়া পদের ১টি শূন্য; হিসাবরক্ষক ও মুদ্রক্ষরিকসহ ১০টি পদের মধ্যে ৮টিসহ তৃতীয়-চতুর্থ শ্রেণির মোট ১৫টি পদ শূন্য রয়েছে। এতে হাসপাতালের ভিতর ও বাহির সবসময় অপরিস্কার-অপরিচ্ছন্ন থাকছে, হাসপাতাল এলাকায় অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়েছে। সবমিলিয়ে সরকারি এ হাসপাতালটিতে স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অপর দিকে দাপ্তরিক কার্যক্রম সম্পাদনেও হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্তৃপক্ষকে।
সূত্র আরো জানায়, হাসপাতালটির প্যাথলজি বিভাগে পরীক্ষা-নিরিক্ষার প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি উপস্থিত থাকলেও ল্যাব সহকারি নেই। আধুনিক এক্সরে মেশিন থাকলেও নেই ট্যাকনিশিয়ান, কম্পিউটারাইজ আল্ট্রাসনোগ্রাফি মেশিন রয়েছে, কিন্তু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ডাক্তার বা সহকারি নেই। ফলে বর্হিবিভাগ ও আন্ত:বিভাগের রোগীরা স্বল্পমূল্যে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করানো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। রোগিরা বাধ্য হয়ে চড়ামূল্য দিয়ে বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে পরীক্ষা-নিরিক্ষা করতে হচ্ছে। এতে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে সাধারণ মানুষ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারি জানান, উপজেলায় ৮টি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র রয়েছে। ওইগুলোতে শুধুমাত্র নারী ও শিশুদের সাধারণ রোগের চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। একটু ভালো চিকিৎসা পাওয়ার জন্য সরকারিভাবে উপজেলার প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্র হচ্ছে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি। হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ৫০-৬০জন রোগি ভর্তি থাকে। এছাড়া ৫০০ থেকে ৬০০ জন রোগি বর্হিবিভাগে চিকিৎসা সেবা নিতে আসে। কিন্তু চিকিৎসকের বেশিরভাগ পদগুলো শূন্য থাকায় ৭জন চিকিৎসক দিয়ে সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না। অপরদিকে পরীক্ষা-নিরিক্ষার যন্ত্রপাতি থাকলেও লোকবল নেই। এতে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য সেবা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যে কয়েকজন চিকিৎসক পদে আদিষ্ট রয়েছেন, তাঁদের অনেকেও অফিস সময় স্থানীয় বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে সময় দিচ্ছে। কেউ কেউ মেডিকেল রিপ্রেজেনটেটিভদের নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এতে নূন্যতম চিকিৎসাও পাচ্ছে না সেবা প্রত্যাশিরা।
তারা বলছেন, একদিকে চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারি সংকট রয়েছে। অপরদিকে যারা কর্মরত আছেন তাদের মধ্যেও আভ্যন্তরিক কিছু সমস্যা রয়েছে। ফলে দেখা যায় কখনও কখনও হাসপাতালে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষিত সেবিকা থাকা স্বত্বেও কারো কারো মদদে অস্থায়ী নিয়োগপ্রাপ্ত আয়া স্বরসতি প্রসূতি মায়ের ডেলিভারি করাচ্ছেন। এতে মা ও শিশুর মৃত্যু ঝুঁকি থাকে। গত দুইদিন আগেও ফয়েজেতুন্নেছা নামে এক প্রসূতির ডেলিভারি করিয়েছে ওই আয়া। এ বিষয়ে সেবিকারা কিছু বলতে গেলে তাদের ওপর কর্তৃপক্ষের অনেকে চড়াও হচ্ছেন।
সূত্র জানায়, প্রতিদিনই গর্ভবতি বা প্রসূতি মায়েরা হাসপাতালে আসছেন। কিন্তু গাইনি সার্জারী বিভাগে সার্জন ও এনেসথেসিয়া বিভাগের কোন কনসালটেন্ট না থাকায় সিজার করা দায় হয়ে যায়। অত্যন্ত জুরুরি হলে ৬ মাসের ই.ও.সি (গাইনি ও অবস) সার্জন ডা. রৌশন জাহান লাকী ও ৬ মাসের ই.ও.সি (এনেসথেসিয়া) মেডিকেল অফিসার ডা: জায়েদ বাশরী সিজার করাচ্ছেন।
চিকিৎসকসহ লোকবল সংকটের কথা স্বীকার করে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম বলেন, এক কথায় লোকবল সংকটের কারণে চিকিৎসা সেবা ব্যহত হওয়াসহ হাসপাতালের পরিবেশও সুন্দর রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এক প্রশ্নে তিনি বলেন, মাসিক রিপোর্টে সংকটের বিষয়গুলো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হচ্ছে। কিন্তু কিছুই হচ্ছে না।
এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা সিভিল সার্জন ডা. মো. মজিবুল হক বলেন, কোম্পানীগঞ্জ হাসপাতালের লোকবল সংকটের বিষয়টি তিনি অবহিত রয়েছেন। তবে কর্মকর্তা-কর্মচারি নিয়োগ সংক্রান্ত ১৯৮৫ সনের আইন রহিত হওয়ার কারণে নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। নুতন করে নিয়োগের বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিলে এ সংকট দুরিভূত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *