ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গাদের পুর্নবাসন হবে অমানবিক

হাতিয়া: প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারের সরকারী বাহিনী কর্তৃক নির্যাতনের শিকার হয়ে জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর উপকূলীয় হাতিয়া উপজেলার বিচ্ছিন্ন দুর্গম দ্বীপ ঠেঙ্গারচরে সাময়িকভাবে পুনর্বাসন করার জন্য সরকার নীতিগত ভাবে সিদ্ধান্ত নিয়েছে , যে দ্বীপ কোন ভাবেই বাসযোগ্য নয়, যেখানে প্রতিমুহুর্তে রয়েছে মৃত্যুঝুঁকি। ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গাদের পুর্নবাসন হবে অমানবিক।

নোয়াখালী জেলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কি:মি:, উপকূলীয় উপজেলা সুবর্ণচর উপজেলা হতে প্রায় ৫০ কি:মি:, হাতিয়া উপজেলা থেকে ২৫ কি:মি: সন্দ্বীপ উপজেলার পশ্চিম উপকূল হতে ৫ কি:মি: দুরত্বে মেঘনা নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত এই বিচ্ছিন্ন এবং জনশূন্য দ্বীপ ঠেঙ্গারচর । যেখানে প্রায়ই জোঁয়ার ভাটায় প্লাবিত হয় এ ঠেঙ্গারচর।

জানা যায়, সন্দ্বীপের পশ্চিম উপকূলে মেঘনার মোহনায় প্রায় ১১ বছর পূর্বে জেগে ওঠে এ নতুন চর, জেলেরা এই চরের নাম দেয় ঠেঙ্গারচর। সেখানে কোনো মানুষের বসতি নেই, কোন ধরনের মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। এটি বনদস্যু ও জলদস্যুরদের অভয়ারণ্য।

ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, কক্সবাজারে অবস্থানরত ও নিবন্ধিত মিয়ানমারের নাগরিকদের মানবিক কারণে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত অস্থায়ীভাবে নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার ঠেঙ্গারচরে প্রায় ৭০ হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে ঠেঙ্গারচরে সাময়িকভাবে আশ্রয় দেওয়ার কথা ভাবছে বাংলাদেশ সরকার। মন্ত্রীর এই বক্তব্য সংবাদ মাধ্যমে আসার পর থেকে জনমনে নানান প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গবাদী পশু মালিক ও রাখালরা (লোকাল নাম বাতাইন্যা) জানান ,যখন নদী শান্ত থাকে, তখন জলদস্যুরা জেলেদের অপহরণের খোঁজে এখানে আস্তানা পাতে। জেলেদের কাছ থেকে আদায় করে মুক্তিপণ। এই দ্বীপকে ঘিরে গড়ে উঠেছে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্য। অস্ত্র ও মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য নিরাপদ দ্বীপ এই ঠেঙ্গারচর।

মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরের জেলে কালাম মাঝি জানান, ভরা মেীসুমে ঠেঙ্গারচরে অবস্থানরত জলদস্যুরা জেলেদের কাছ থেকে মোটা অংকের চাঁদা আদায় করে। ২০১৬ সালের ইলিশ মেীসুমে মেঘনার মোহনা হতে আমার মাছ ধরার ট্রলার ও জেলে সহ ঠেঙ্গারচর নিয়ে যাওয়ার ৩ দিন পর ৫০ হাজার টাকা মুক্তিপন নিয়ে ছেড়ে দেয়। এসময় আমাদেরকে অমানবিক নির্যাতন করে দস্যুরা।

এসব বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চালে কাঁকড়া শিকার করতে যাওয়া শুকু মাঝি ও বিহার মাঝি জানান, ঠেঙ্গারচর আশ্রয় নেওয়া জলদস্যুরা আমাদের নৌকা ও লোকজন নিয়ে যায় ঠেঙ্গারচরে, পরে ৪০ হজার টাকা মুক্তিপন নিয়ে ছেড়ে দেয়।

এদিকে ২০১৫ সালে মানবশূন্য ঠেঙ্গারচরে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার প্রথম প্রস্তাব ওঠে। সেই সময়ই এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকারকর্মীদের তুমুল সমালোচনার মুখে থমকে যায় প্রস্তাব।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুবর্ণচর,হাতিয়া, কোম্পানীগঞ্জ, কবিরহাট, সন্দ্বীপ উপজেলার গবাদী পশু মালিক ও রাখালরা (লোকাল নাম বাতাইন্যা) জানান, ঠেঙ্গারচরে কাউয়া কালাম বাহিনী, ফকিরা বাহিনী,ভুট্টু বাহিনী,হানিফ বাহিনী মত জলদস্যুরা সক্রিয় রয়েছে। যারা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন অপরধ কর্মকান্ড চালাচ্ছে এসব বিচ্ছিন্ন দ্বীপ সমুহে

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলা নিবার্হী কর্মকর্তা খোন্দকার মোহাম্মদ রিজাউল করিম জানান, এখনো তাদের কাছে কোন নির্দেশনা আসেনি। এই ঠেঙ্গার চরের দৈর্ঘ্য ৮ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৪.৫ কিলোমিটার (প্রায় ১০ হাজার একর)। হাতিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দুরে অবস্থিত।

এই দ্বীপটি ভরা কাটালের জোয়ারের সময় পানিতে তলিয়ে যায়। তখন দ্বীপটির সাথে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন থাকে। মাছ ধরার নৌকায় করে হাতিয়া থেকে ঠেঙ্গারচরে পৌঁছতে সময় লাগে আড়াই থেকে ৩ ঘন্টা। জায়গাটি ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ। নিচু হওয়ায় চরটি বর্ষা মৌসুমে জোয়ারে প্লাবিত হয়। যাতায়াত ব্যবস্থাও নাজুক। জনশূন্য এলাকাটি কর্দমাক্ত ও গহীন বন।

আব্দুল বারী বাবলু ঠেঙ্গারচর, হাতিয়া থেকে ফিরে

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *